যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষককে পদোন্নতি না দিয়ে নতুনদের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি, আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে চলতি দায়িত্বে থাকা শিক্ষকেরাও নিয়মিত পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং শিক্ষার সামগ্রিক গুণগতমান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ১০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭২টিতেই দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এতে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পাঠদান ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়ও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলার ৮০টি বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী কাম দপ্তরি না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মোট পদের ৩৫ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার কথা। তবে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া অনেক প্রধান শিক্ষক ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। অন্যদিকে, আইনি জটিলতার কারণে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।
দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পাওয়ায় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রধান শিক্ষক সংকট ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি নৈশপ্রহরীর অভাবও বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। উপজেলার ৮০টি বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী না থাকায় রাতের সময় বিদ্যালয় ভবন, আসবাবপত্র ও মূল্যবান সরকারি সরঞ্জাম অরক্ষিত অবস্থায় থাকছে। দ্রুত এসব শূন্যপদ পূরণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিরাপত্তার ঘাটতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক ফ্যানসহ সরকারি সরঞ্জাম চুরির ঘটনা ঘটছে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়গুলোর ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি এস কে মোহাম্মদ আলী দুলাল ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম বলেন, অনেক শিক্ষক ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি করছেন। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের পদোন্নতি না দিয়ে নতুনদের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। আইনি জটিলতার কারণে চলতি দায়িত্বে থাকা শিক্ষকেরাও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মহসিন আলী বলেন, সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির বিষয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি কার্যক্রম আটকে আছে। তবে শূন্যপদের তালিকা নিয়মিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে। নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এ সংকট দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাছান বলেন, প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সারা দেশেই একই ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে। এ পদে মামলাজনিত জটিলতা রয়েছে। সরকার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পিএসসির মাধ্যমে করবে, নাকি পদোন্নতির মাধ্যমে—এ সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকার নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নৈশপ্রহরী সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে। পর্যায়ক্রমে শূন্যপদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
৫টি সাধারণ প্রশ্ন
ফুলবাড়ী উপজেলায় কতটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই?
ফুলবাড়ী উপজেলার ১০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭২টিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক না থাকায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে?
প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদান ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
কেন প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি আটকে আছে?
আইনি জটিলতা ও উচ্চ আদালতে চলমান মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
ফুলবাড়ীতে কতটি বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী নেই?
উপজেলার ৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী কাম দপ্তরি না থাকায় বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক সংকট কবে সমাধান হতে পারে?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রধান শিক্ষক সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার আশা রয়েছে।
উপসংহার
ফুলবাড়ীর ৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি নৈশপ্রহরীর সংকট বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শূন্যপদ পূরণ করা জরুরি।




