পাঠদানের দায়িত্বের তুলনায় এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি অংশ রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততার কারণে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ ও নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রমের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

পাঠদানের দায়িত্বের পাশাপাশি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি অংশ রাজনীতিতে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠছেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রস্তাবিত নতুন আচরণবিধির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান বাড়াতে দেশব্যাপী অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন চালু, প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি ক্লাস পর্যবেক্ষণ এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১৫ দফা অনুশাসন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষকদের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে পদক ও পুরস্কার এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পাঠ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর প্রস্তুতিও চলছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতিও নিয়মিত জানাতে বলা হয়েছে।
আচরণবিধির খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ
শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যমান একটি খসড়া পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের পর চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে কিছু শিক্ষকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি তাদের মূল দায়িত্ব পালনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং পাঠদানে মনোযোগ কমে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ও শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষকরা এর দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। অতীতে কিছু শিক্ষককে পাঠদানের তুলনায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগী হতে দেখা গেছে। এর প্রভাব সার্বিক ফলাফলেও পড়েছে।
তার মতে, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
১৫ দফায় শ্রেণিকক্ষকে বিশেষ গুরুত্ব
গত ২৮ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে একটি পর্যালোচনা সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হয়।
কর্মকর্তারা জানান, আনন্দময় শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, কোচিংনির্ভরতা ও স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় শিক্ষকদের আচরণবিধি সংশোধন, অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা, সিসি ক্যামেরা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, শিক্ষক পুল এবং ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর মতো প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ১৫ দফা অনুশাসন দেন। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের আচরণবিধি সংশোধন, দেশব্যাপী অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন প্রণয়ন, অনলাইন মনিটরিং এবং ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা রয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষক প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন, অব্যবহৃত সরকারি ভবন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই, গণিত-ইংরেজি-বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট দূর করা, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ শিক্ষকদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষা পরিকল্পনায় গবেষণাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ভালো চর্চাগুলো ছড়িয়ে দিতে ‘টিচার্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ চালুর নির্দেশনাও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গত ৬ আগস্ট এ বিষয়ে ‘রেকর্ড অব নোটস’ ও কার্যবিবরণী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি ক্লাস পর্যবেক্ষণ
১৫ দফার অধিকাংশ বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) গত ২০ আগস্ট সভা করে বিভিন্ন উইংয়ের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন এবং সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করেছে।
মাউশির অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। আইসিটি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩ লাখ ৫ হাজার ২৮৮ জন শিক্ষক-কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে দক্ষ শিক্ষকদের নিয়ে ‘মাস্টার ট্রেইনার পুল’ এবং ‘টিচার্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ চালুর কাজও এগিয়ে চলছে।
এনসিটিবির সঙ্গে সমন্বয় করে অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করতে প্রধান শিক্ষকদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর পিডিএসে হালনাগাদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি মাউশির সহকারী পরিচালকরা ‘ডিএমএস অ্যাপ’-এর মাধ্যমে ভিডিও কল ব্যবহার করে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন।
‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর প্রস্তুতি
গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে নতুন ক্যাটাগরিতে শিক্ষকদের পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি সংসদ টেলিভিশনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর খসড়া কর্মপরিকল্পনাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করতে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অংশগ্রহণ ও সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন কঠোর হচ্ছে?
এমপিওভুক্ত কিছু শিক্ষক-কর্মচারীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততার কারণে স্বাভাবিক পাঠদান ও শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে আচরণবিধি কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন আচরণবিধিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হচ্ছে।
শিক্ষকদের পাঠদানের মান বাড়াতে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন, প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হবে?
মাউশির পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রযুক্তি ও ডিএমএস অ্যাপ ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভিডিও কলের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন।
শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে আর কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, ‘মাস্টার ট্রেইনার পুল’, ‘টিচার্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ এবং ভালো কাজের স্বীকৃতি ও পুরস্কারের মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উপসংহার
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আচরণবিধি, নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সহশিক্ষা কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা বাড়বে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কার্যকর ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে।




