গত দেড় যুগ ধরে যে প্রশ্নটি তুলে আসছি, আজও সেই একই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরব।
তার আগে পুরোনো সেই প্রশ্নটি আবারও তুলতে হচ্ছে—বরং বলা যায়, তুলতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পচনশীল সমস্যাগুলোকে কেবল সংস্কারের মাধ্যমে আর সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন ও কার্যকর রূপান্তরের।
সংস্কার যেখানে সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে ব্যর্থ, সেখানে সময়ের দাবি হলো—সমস্যার মূল কাঠামোতেই পরিবর্তন আনা।

কয়েকটি চিহ্নিত টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রিকার পাতা খুললেই একসময় চোখে পড়ত—‘শতভাগ জিপিএ-৫’, ‘শতভাগ পাস’সহ নানা গালভরা বিজ্ঞাপন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই বিজ্ঞাপনগুলো অনেকটাই উধাও। একই সময়ে শতভাগ জিপিএ-৫ এবং ফলাফলকেন্দ্রিক বাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জিপিএ-৫ কেনাবেচার অভিযোগে আলোচিত ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিক লায়ন এম কে বাশার ওরফে খায়রুল বাশার বাহার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণেও মামলার সংখ্যা ও অভিযোগের মাত্রা বিবেচনায় তাঁর জামিনের সম্ভাবনা কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার ফলাফলকেন্দ্রিক বাণিজ্য, প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রশ্ন হলো—একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার দুটি প্রতিষ্ঠানের একজন মালিক ও অধ্যক্ষের বিরুদ্ধেও কি একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল না? অভিভাবক ও ভুক্তভোগীদের মধ্যে এমন অভিযোগও রয়েছে যে, একজন সাবেক এমপি ও সাবেক অধ্যক্ষের প্রভাবের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগটি সত্য হলে এর জবাবদিহি কোথায়?
গত ১৬ বছরে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন তৎকালীন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা—এমন তথ্য ও অভিযোগও সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বিদেশে অবস্থানরত সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আমিরুল পলাশ, উপ-কলেজ পরিদর্শক অদ্বৈত কুমার এবং শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী সমিতির একাধিক নেতার নামও আলোচনায় এসেছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রিয় পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে—গত ১০ আগস্ট মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ‘শতভাগ জিপিএ-৫’ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ সামনে আসে। এমনকি ‘জিপিএ-৫ কেলেঙ্কারি’ নিয়ে নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসকে শিক্ষা বোর্ডের শোকজ করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—শতভাগ জিপিএ-৫ নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন অতিথি হওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? একজন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা যদি একই প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে নিয়মিত প্রধান অতিথি হন, তাহলে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয়?
এই লেখার লেখক সিদ্দিকুর রহমান খান দৈনিক শিক্ষাডটকম ও দৈনিক আমাদের বার্তার প্রতিবেদন, লাইভ অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে বহুবার তুলে ধরেছেন ‘শতভাগ পাস’-এর তথাকথিত সাফল্যের আড়ালে থাকা শুভংকরের ফাঁকি নিয়ে প্রশ্ন। বিশেষ করে সারা বছর পড়াশোনা করার পর পাবলিক পরীক্ষার কয়েক মাস আগে কিছু শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে টিসি দেওয়ার অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ফলাফলের হার কৃত্রিমভাবে বাড়াতে শিক্ষার্থী বাদ দেয়, তবে সেটি শুধু শিক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায় নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও আঘাত।
নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমস, যাত্রাবাড়ীর মাহবুবুর রহমান মোল্লা, শামসুল হক খান এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শাখা থাকা ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ—এসব প্রতিষ্ঠানের শতভাগ পাস ও শতভাগ জিপিএ-৫ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যে বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা কি জাতি পাওয়ার অধিকার রাখে না?
গত দেড় যুগ ধরে যে প্রশ্নটি তুলে আসছি, আজও সেই প্রশ্নই প্রাসঙ্গিক। আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই আরও কয়েকটি বিষয় সামনে আনব। তার আগে পুরোনো প্রশ্নগুলো আবারও তুলতে হচ্ছে—বরং বলা যায়, তুলতে বাধ্য হচ্ছি।
কারণ দীর্ঘদিন ধরে পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়ানো এসব সমস্যাকে কেবল প্রচলিত সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত রূপান্তর।
রূপান্তরের আশায় কয়েকটি প্রশ্ন
শিক্ষা বোর্ডের পাবলিক পরীক্ষা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা কেন এমন সব স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে বারবার প্রধান অতিথি হবেন, যেসব প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাস বা শতভাগ জিপিএ-৫ নিয়ে জনমনে প্রশ্নের মুখে?
কোনো প্রতিষ্ঠানের ফলাফল নিয়ে তদন্ত বা শোকজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার যৌক্তিকতা কী?
কোনো পরিদর্শক বা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিপুলসংখ্যক কপি ও উচ্চমূল্যে কেনার অভিযোগ থাকলে তার স্বচ্ছ তদন্ত হবে না কেন?
শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ অবকাঠামোগত বিষয় পরিদর্শনের জন্য উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা যেখানে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেখানে শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিদ্যালয় পরিদর্শক কিংবা কর্মচারী সমিতির নেতাদের নিয়মিত সম্পৃক্ততার প্রয়োজন কেন?
এসএসসি পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে প্রধান অতিথি করতেই হবে—এমন প্রথার প্রয়োজনীয়তা ও নীতিগত ভিত্তি কী?
সার্টিফিকেট জালিয়াতির মামলায় যেসব শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং যাদের জামিন আদালত নামঞ্জুর করেছেন, তাঁদের বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না কেন?
তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছতার স্বার্থে জাতির সামনে প্রকাশ করা হবে না কেন?
অভিযোগে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না কেন?
নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসসহ যেসব প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে, তাদের মালিক ও অধ্যক্ষদের সম্ভাব্য চাপ বা প্রভাব থেকে শিক্ষা বোর্ডের নবনিযুক্ত সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের সুরক্ষায় মন্ত্রণালয় কি কার্যকর উদ্যোগ নেবে না?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শতভাগ পাস ও শতভাগ জিপিএ-৫ নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের শোকজের জবাব ও তদন্তের ফলাফল জনস্বার্থে প্রকাশ করা হবে না কেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তি বিশেষকে হেয় করার জন্য নয়। প্রশ্নগুলো উঠছে শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, পাবলিক পরীক্ষার ন্যায্যতা এবং অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের আস্থার স্বার্থে।
শিক্ষার মতো একটি মৌলিক খাতে ফলাফলের কৃত্রিম সাফল্য, প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অস্বচ্ছ সম্পর্ক কিংবা অভিযোগের পরও জবাবদিহির অনুপস্থিতি—কোনোটিই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাই এবার প্রয়োজন শুধু সংস্কারের ঘোষণা নয়; প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং কাঠামোগত রূপান্তর। কারণ যে সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে পচন ধরেছে, সেখানে সামান্য সংস্কার নয়—প্রয়োজন মূল কাঠামোর পরিবর্তন।
প্রশ্ন: শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়া স্কুলে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা অতিথি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন কেন?
কোনো প্রতিষ্ঠানের ফলাফল নিয়ে গুরুতর অভিযোগ বা বিতর্ক থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের ঘন ঘন অতিথি হওয়া তাঁদের নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাই বিষয়টি স্বচ্ছতার দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শতভাগ জিপিএ-৫ কি নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ?
না। শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়া নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। তবে একই সঙ্গে যদি শিক্ষার্থী বাছাই, টিসি দেওয়া, ফলাফল কৃত্রিমভাবে বাড়ানো বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগটি কী?
অভিযোগের মূল জায়গা হলো—যেসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন বা তদন্ত রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিক ঘনিষ্ঠতা কেন থাকবে। এটি স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি করছে কি না, সেটিই তদন্তের বিষয়।
প্রশ্ন: শোকজ করা প্রতিষ্ঠানের জবাব কি জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত?
উত্তর: জনস্বার্থ ও শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতার স্বার্থে, আইন ও প্রশাসনিক বিধি অনুমোদন করলে অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের জবাব এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে গুজবের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
সমাধান কী—সংস্কার, নাকি কাঠামোগত পরিবর্তন?
লেখাটির মূল বক্তব্য হলো, দীর্ঘদিনের ফলাফলকেন্দ্রিক অনিয়ম ও জবাবদিহির ঘাটতি শুধু সাময়িক সংস্কারে সমাধান হবে না; প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, কঠোর জবাবদিহি এবং শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
উপসংহার
শতভাগ পাস কিংবা শতভাগ জিপিএ-৫ কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না, যদি সেই ফলাফলের পেছনে শিক্ষার্থী বাছাই, টিসি দেওয়া, প্রভাব খাটানো কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে। একইভাবে, অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠতা যদি জনমনে সন্দেহ তৈরি করে, তাহলে সেই সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই।





