ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ায় পূর্ণ মেয়াদ থেকে ‘বঞ্চিত’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ায় পূর্ণ মেয়াদ থেকে ‘বঞ্চিত’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাটিউটের ৩৬(১) ধারায় চেয়ারম্যানকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে জানা গেছে, নিয়োগপত্রে ৪৩(১) ধারার উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেই বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। বরং ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনকেও পূর্ণ দায়িত্বের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিভাগীয় চেয়ারম্যানের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনের সময়কালকেই নিয়মিত চেয়ারম্যানের মেয়াদের অংশ হিসেবে গণনা করা হচ্ছে। ফলে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব শেষে নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা নতুন করে পূর্ণ তিন বছরের মেয়াদ পাচ্ছেন না। সম্প্রতি পাঁচ অধ্যাপককে নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন হিসাবের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানান, ভারপ্রাপ্ত ও নিয়মিত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব এক নয়। বিভাগীয় সংকট কিংবা চেয়ারম্যান পদ শূন্য থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে সাময়িকভাবে কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে নতুন করে পূর্ণ মেয়াদ শুরু হওয়াই স্বাভাবিক। তবে ঢাবির বর্তমান সিদ্ধান্তে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কেও নিয়মিত চেয়ারম্যানের তিন বছরের মেয়াদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি বিভাগে চেয়ারম্যান পদ শূন্য হয়। প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগে ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ড. অনিমেষ পাল, সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে ড. আবু হেনা মো. ইউসুফ এবং মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগে ড. মোহাম্মদ মামুন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

চলতি বছরের ১৭ মে জারি করা চিঠিতে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরীকে ২৪ অক্টোবর ২০২৪ থেকে তিন বছরের জন্য নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একইভাবে ১৫ জুলাইয়ের চিঠিতে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের ড. আবু হেনা মোহাম্মদ ইউসুফকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে, ১৬ জুলাইয়ের চিঠিতে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. অনিমেষ পালকে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে এবং ৪ আগস্টের চিঠিতে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকীকে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে তিন বছরের জন্য নিয়মিত চেয়ারম্যান করা হয়।

অর্থাৎ, নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের তারিখ থেকে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই তিন বছরের মেয়াদ গণনা করা হয়েছে। এর ফলে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনের সময়কালও নিয়মিত চেয়ারম্যানের মেয়াদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাটিউটের ৩৬(১) ধারায় চেয়ারম্যানকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে জানা গেছে, নিয়োগপত্রে ৪৩(১) ধারার উল্লেখ থাকলেও সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। বরং ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বকেও পূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে একীভূত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিষয়টির আইনি দিক জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ মৌ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত বা রুটিন দায়িত্ব থেকে নিয়মিত পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত সময়কাল সাধারণত মূল নিয়োগের মেয়াদ হিসেবে গণনা করা যায় না। কোনো শিক্ষককে নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর তিনি যেদিন ওই পদে যোগদান করবেন, সেদিন থেকেই মূল পদের মেয়াদ গণনা শুরু হওয়ার কথা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের ঘটনাতেও অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের সঙ্গে পূর্ণকালীন দায়িত্বের মেয়াদ একীভূত করার নজির পাওয়া যায় না। ২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক অস্থায়ী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। পরে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট তিনি পূর্ণকালীন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। একইভাবে ২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ড. মো. আখতারুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি চার বছরের জন্য পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পান।

বঞ্চনার অভিযোগ তুলে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু হেনা মো. ইউসুফ বলেন, শুরুতে তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হতে চাননি, এমনকি চেয়ারম্যানের দায়িত্বও নিতে আগ্রহী ছিলেন না। তারপরও প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত সময়কেই নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার প্রশ্ন, এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা মানবিক?

মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরী বলেন, ১৯৭৩ সালের আদেশের আওতায় পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের পর পূর্ণাঙ্গ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে নতুন মেয়াদ গণনা করা হয়েছে। এটিই প্রচলিত ও সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাকে পরপর দুইবার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে একটি বিধ্বস্ত বিভাগে দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দুই বছরে বিভাগটিকে কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছেন। এখন যদি তার পূর্ণাঙ্গ নিয়োগের মেয়াদ থেকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের সময় বাদ দেওয়া হয়, তাহলে তিনি বঞ্চিত হবেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। যেদিন থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেদিন থেকেই তাদের পূর্ণকালীন দায়িত্বের মেয়াদ শুরু হয়েছে বলে ধরা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পর ইতোমধ্যে অনেকের প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেছে। এখন যদি ওই দুই বছর বাদ দিয়ে আবার পূর্ণ তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে একই ব্যক্তি মোট পাঁচ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। তার প্রশ্ন, একজনকে মোট পাঁচ বছর দায়িত্ব দেওয়া হলে সেটি কতটা ন্যায়সংগত হবে? একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন ব্যক্তির মধ্যে দীর্ঘ সময় ক্ষমতা ধরে রাখার এমন আগ্রহ কেন তৈরি হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চেয়ারম্যানের মেয়াদ কত বছর?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাটিউট ৩৬(১) অনুযায়ী বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বের সময় কেন আলোচনায় এসেছে?

নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর নতুন করে তিন বছরের মেয়াদ শুরু না করে, আগে পালন করা ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের সময়কেও তিন বছরের মেয়াদের মধ্যে গণনা করা হচ্ছে।

এতে শিক্ষকদের কী ধরনের বঞ্চনার অভিযোগ উঠেছে?

শিক্ষকদের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের সময় বাদ না দেওয়ায় নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তারা কার্যত পূর্ণ তিন বছরের মেয়াদ পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে আইনজীবীর মত কী?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ মৌয়ের মতে, ভারপ্রাপ্ত বা রুটিন দায়িত্বের সময়কাল সাধারণত নিয়মিত পদে মূল নিয়োগের মেয়াদের অংশ হিসেবে গণনা করা উচিত নয়। নিয়মিত নিয়োগের পর দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই মূল মেয়াদ শুরু হওয়ার কথা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য কী?

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেছেন, নিয়মের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব শুরুর তারিখ থেকেই সংশ্লিষ্টদের পূর্ণকালীন দায়িত্বের মেয়াদ গণনা করা হয়েছে।

উপসংহার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের সময়কে নিয়মিত চেয়ারম্যানের মেয়াদের সঙ্গে যুক্ত করায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পূর্ণ তিন বছরের মেয়াদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক ও আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্নমত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি ও অসন্তোষের অবসান হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top