উচ্চশিক্ষা রূপান্তরে পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে ইউজিসি

উচ্চশিক্ষা রূপান্তরে পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে ইউজিসি

সভায় ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা, দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আধুনিক শ্রমবাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে দেশের উচ্চশিক্ষাকে আরও কার্যকরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, এই উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার প্রসার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘উচ্চশিক্ষা রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষ অর্জনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২৬–২০৩০)’ চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)।

এ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ইউজিসি চেয়ারম্যানের সভাকক্ষে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়া নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।

সভায় ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা, দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং শ্রমবাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে দেশের উচ্চশিক্ষাকে আরও কার্যকরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি জানান, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চশিক্ষা রূপান্তরবিষয়ক জাতীয় কর্মশালার সুপারিশ, সরকারের অগ্রাধিকার এবং ইউজিসির কৌশলগত পরিকল্পনার সমন্বয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি এ কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, কর্মপরিকল্পনায় পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—স্নাতকদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধি ও চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাতের সহযোগিতা জোরদার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি; ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার; শিক্ষক উন্নয়ন ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি; গবেষণার উৎকর্ষ, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিকীকরণ; এবং সুশাসন, মাননিশ্চিতকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম-বেইজড এডুকেশন (ওবিই), ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), ডিজিটাল প্রশাসন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা প্রকাশনা ও পেটেন্টের সংখ্যা দ্বিগুণ করা, আন্তর্জাতিক গবেষণা ও একাডেমিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ, সমন্বিত জাতীয় উচ্চশিক্ষা তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করার আগে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষাবিদ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে ধারাবাহিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে এ পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।

সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের রূপান্তরের রূপরেখা ইউজিসির কাছ থেকেই আসা উচিত। কারণ, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক ও সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউজিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষাকে কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত করতে কমিশনের নেতৃত্বকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সফল উচ্চশিক্ষা সংস্কারের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীন, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি নয়, বরং তাদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ নিশ্চিত করা। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষার অন্যতম গন্তব্যে পরিণত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি, একাডেমিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিকীকরণে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, দেশের বিপুল জনসংখ্যা একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ। পরিকল্পিত উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগের মাধ্যমে এ জনসম্পদকে জাতীয় উন্নয়নের কার্যকর শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

আলোচনা সভায় ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক ড. মো. সাইদুর রহমান, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম, অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, ইউজিসি সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলামসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

৫টি সাধারণ জিজ্ঞাসা

ইউজিসির পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনার উদ্দেশ্য কী?

দেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, গবেষণা ও উদ্ভাবন জোরদার করা এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই এ কর্মপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

কর্মপরিকল্পনার মেয়াদ কতদিন?

এটি ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা হিসেবে প্রণয়ন করা হচ্ছে।

কর্মপরিকল্পনায় কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে?

স্নাতকদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর ও এআই ব্যবহার, শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিকীকরণ, সুশাসন এবং মাননিশ্চিতকরণকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে কী কী লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে?

সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম-বেইজড এডুকেশন (ওবিই), লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), ডিজিটাল প্রশাসন, এআইভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু এবং গবেষণা প্রকাশনা ও পেটেন্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কীভাবে চূড়ান্ত করা হবে?

সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষাবিদ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী এবং সুশীল সমাজের মতামত গ্রহণের পর পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ইউজিসির প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী উদ্যোগ। ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, গবেষণার উৎকর্ষ, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক মানদণ্ডে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ কর্মপরিকল্পনা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক ও টেকসই পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top