প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের অদক্ষতায় এমপিও জালিয়াতি ও বিশৃঙ্খলা

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের অদক্ষতায় এমপিও জালিয়াতি ও বিশৃঙ্খলা

অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডগুলো থেকে সরবরাহ করা ‘অতি গোপনীয়’ পাসওয়ার্ড আর গোপন থাকেনি।

শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা বোর্ড থেকে সরবরাহ করা অতি গোপনীয় পাসওয়ার্ড কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কাছেই সংরক্ষিত থাকার কথা। তবে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতি, অনীহা ও অবহেলার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানপ্রধান এসব পাসওয়ার্ড স্থানীয় কম্পিউটার দোকানি, অফিস সহকারী কিংবা সহকারী শিক্ষকদের কাছে দিয়ে দিচ্ছেন। ফলে এমপিওভুক্তি, বিএড স্কেল, উচ্চতর স্কেল, শিক্ষার্থীদের তথ্য এবং পরিচালনা কমিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের গোপনীয়তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে এমপিওভুক্তিতে জালিয়াতির সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি হাজারো প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য তৃতীয় পক্ষের হাতে গিয়ে ব্যবসায়িক বা অনৈতিক কাজে ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই থেকে ব্যক্তির এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকাকেন্দ্রিক তিনটি শিক্ষা অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও হয়রানি কমানো এবং এমপিওপ্রত্যাশীদের ঢাকায় যাতায়াতসহ বিভিন্ন দুর্ভোগ লাঘব করা। তবে বাস্তবে এর সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব ও দায়িত্বে অবহেলা এর অন্যতম কারণ।

দেশের বিভিন্ন জেলার শতাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ড থেকে দেওয়া অতি গোপনীয় পাসওয়ার্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। এসব পাসওয়ার্ড অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত কম্পিউটার, ফটোকপি ও প্রিন্টিং দোকানের কর্মীদের কাছে চলে যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ অফিস সহকারী বা সহকারী শিক্ষকের কাছেও পাসওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে।

এমপিও, পদোন্নতি, বিএড স্কেল ও উচ্চতর স্কেলসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে এসব দোকানে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কম্পিউটার ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করার কথা।

একাধিক জেলা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মতে, শিক্ষা অধিদপ্তরের এমপিও প্রক্রিয়াকরণ সেল, যা ইএমআইএস সেল নামে পরিচিত, সেখান থেকে দেওয়া পাসওয়ার্ড প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য। এমপিওভুক্তির আবেদন এবং সরকারি বেতন-ভাতার অংশ প্রদানের জন্য ইএফটি কার্যক্রমেও এসব পাসওয়ার্ড প্রয়োজন হয়। কিন্তু পাসওয়ার্ড বাণিজ্যিক কম্পিউটার দোকানিদের হাতে চলে যাওয়ায় এমপিও আবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের জালিয়াতি প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর তথ্যও অনিরাপদ হয়ে পড়ছে।

মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগতভাবে অদক্ষ ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা আরও বাড়ছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীদের ন্যূনতম প্রযুক্তিগত দক্ষতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানপ্রধান ইতোমধ্যে তাদের গোপনীয় পাসওয়ার্ড অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

কর্মকর্তারা আরও জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। পোশাক ও টেইলারিং ব্যবসা, মোবাইল এসএমএস সার্ভিস, অনলাইন টিউটরিং ভিডিও বিক্রেতা এবং নোট-গাইড প্রতিষ্ঠানের এজেন্টদের কাছে শিক্ষার্থীদের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসব তথ্য বেহাত হলে তা বিভিন্ন অনৈতিক বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।

প্রসঙ্গত, দেশে প্রায় ৩৭ হাজার বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাদের এমপিওভুক্তি, পদোন্নতিসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের। অন্যদিকে, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত বাছাই ও নিয়োগ সুপারিশের দায়িত্ব পালন করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। নিয়োগের পর এমপিওভুক্তির জন্য নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের।

ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট অব টিচার্স অ্যান্ড এমপ্লয়িজের (এনএফটিই) মুখপাত্র গোলাম রসুল সানি বলেন, ডিজিটাল যুগে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ন্যূনতম প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের অদক্ষতায় কী ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে?

প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ পাসওয়ার্ড অন্যের হাতে চলে যাচ্ছে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।

এমপিও জালিয়াতির সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে?

গোপন পাসওয়ার্ড কম্পিউটার দোকানি বা প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মীদের হাতে চলে যাওয়ায় এমপিও আবেদন ও তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের তথ্য কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে?

প্রতিষ্ঠানের পাসওয়ার্ড তৃতীয় পক্ষের হাতে থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য অননুমোদিতভাবে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।

পাসওয়ার্ড কার কাছে থাকার কথা?

শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া গোপনীয় পাসওয়ার্ড কেবল সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানের কাছেই সংরক্ষিত থাকার কথা।

সমস্যা সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগের সময় প্রযুক্তিজ্ঞান যাচাই এবং গোপনীয় পাসওয়ার্ড অন্যের হাতে তুলে দিলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

উপসংহার

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে এমপিও কার্যক্রমে জালিয়াতি, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং শিক্ষার্থীদের তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, পাসওয়ার্ডের গোপনীয়তা নিশ্চিতকরণ এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top