বিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ের নির্ধারিত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদানের দায়িত্ব পালন করছেন সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক মনিরুল আলম।

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের তীব্র সংকটে যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং শিক্ষার সামগ্রিক গুণগত মানও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যালয় শাখায় বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞান—এই তিনটি মৌলিক বিষয়ে কোনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। অথচ সরকারি জনবল কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি বিষয়ে অন্তত দুইজন করে শিক্ষক থাকার কথা। দীর্ঘদিন ধরে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় পাঠদান কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
কলেজ শাখার অবস্থাও একই রকম উদ্বেগজনক। রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা—প্রতিটি বিষয়ে রয়েছেন মাত্র একজন করে শিক্ষক। এছাড়া বাংলা ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও দায়িত্ব পালন করছেন একজন করে শিক্ষক, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক মনিরুল আলম ইংরেজি পাঠদান করছেন। একইভাবে বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় পরিসংখ্যান বিষয়ের শিক্ষক শাহ আলম বিজ্ঞান ক্লাস পরিচালনা করছেন। আর বাংলা বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় দর্শন বিষয়ের শিক্ষক আবু সাঈদ বাংলা বিষয়ে পাঠদান করছেন।
প্রতিষ্ঠানটিতে তৃতীয় থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। বর্তমানে অনুমোদিত ৬০টি শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৬ জন। আট বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের সময় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ৩১ জন শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষক সংকট ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ১ হাজার ৪১১ জন। এর মধ্যে বিদ্যালয় শাখার তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৮৫০ শিক্ষার্থীর গণিত বিষয়ে পাঠদানের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন শিক্ষক, যদিও এ বিষয়ে কমপক্ষে দুইজন শিক্ষক থাকার কথা।
অন্যদিকে, কলেজ শাখায় প্রতিটি বিষয়ে চারজন করে শিক্ষক থাকার বিধান থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিজ্ঞান বিভাগের পাঁচটি বিষয়ে মোট ২০ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন। একইভাবে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের চারটি বিষয়ে ১৬ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে দুটি বিষয়ে একজন করে মোট দুইজন শিক্ষক রয়েছেন। বাকি দুটি বিষয়ে কোনো শিক্ষকই নেই।
অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক থাকলে পাঠদান আরও কার্যকর ও মানসম্মত হতো। তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ২০০৩–০৪ অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যশোর শিক্ষা বোর্ডের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ একর জমির ওপর যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৭ সালে পাঠদান শুরু হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণ করা হয়। জাতীয়করণের সময় এখানে ৫৭ জন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। তবে সরকারি বিধি অনুযায়ী যোগ্যতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই শেষে ২৬ জন শিক্ষককে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং বাকিরা বাদ পড়েন।
শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ মো. আবদুল হান্নান বলেন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় প্রতিদিন ২০টি শ্রেণিকক্ষের পাঠদান সমন্বয় করা এবং শিক্ষার মান বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত পদ না থাকায় বাধ্য হয়ে এক বিষয়ের শিক্ষককে দিয়ে অন্য বিষয়ের ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যালয় শাখার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এ সংকট নিরসনে নতুন পদ সৃষ্টি ও দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের ক্লাস রুটিন ও দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিদিন একই সময়ে অন্তত ২০টি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান পরিচালিত হয়। অথচ বিদ্যালয় শাখায় ১২টি শ্রেণির জন্য কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৯ জন শিক্ষক, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৩০ জন। কলেজ শাখাতেও একই চিত্র। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ে রয়েছেন মাত্র একজন করে শিক্ষক। উচ্চতর গণিত বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। এছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও রয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকট।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম, শিক্ষার পরিবেশ এবং পাঠদানের মান পুনরুদ্ধারে সরকারি জনবল কাঠামো অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে যশোর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাহফুজুর হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণের সময় নতুন শিক্ষক পদ সৃষ্টি না হওয়ায় বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) আবেদন পাঠানো হলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নতুন পদ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে কেন অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে?
প্রতিষ্ঠানটিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের তীব্র সংকট থাকায় এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে।
কোন শিক্ষক কোন বিষয় পড়াচ্ছেন?
ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক ইংরেজি পড়াচ্ছেন। বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় পরিসংখ্যান বিষয়ের শিক্ষক বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছেন। এছাড়া বাংলা বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় দর্শন বিষয়ের শিক্ষক বাংলা পড়াচ্ছেন।
শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব পড়ছে?
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কতজন শিক্ষক কর্মরত আছেন?
অনুমোদিত ৬০টি শিক্ষকের পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৬ জন শিক্ষক।
শিক্ষক সংকট দূর করতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ নতুন শিক্ষক পদ সৃষ্টি ও দ্রুত নিয়োগের দাবিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে।
উপসংহার
যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ও গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি জনবল কাঠামো অনুযায়ী দ্রুত নতুন শিক্ষক পদ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।



