বৈষম্যের বেড়াজালে প্রাথমিকের দশম গ্রেড, শুভংকরের ফাঁকি

বৈষম্যের বেড়াজালে প্রাথমিকের দশম গ্রেড, শুভংকরের ফাঁকি

সম্মিলিত শিক্ষক সমাজের সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব কিংবা মহাপরিচালকদের সদিচ্ছা বা সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে ১০ম গ্রেডসহ পূর্ণ মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা থেকেই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বাধ্য হয়ে ৪৫ জন প্রধান শিক্ষক মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেছেন।

প্রাথমিক প্রধান শিক্ষকদের মর্যাদার ক্ষেত্রে দশম গ্রেড প্রাপ্তির ঘোষণা বাস্তবে শুভংকরের ফাঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মার্চ তারা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা লাভ করে আশা করেছিলেন—অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের মতো মর্যাদাসহ পূর্ণ দশম গ্রেড নিশ্চিত হবে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে পড়ে শেষ পর্যন্ত তারা দশমের পরিবর্তে একাদশ গ্রেডই পান।

প্রথম দিকে দশম গ্রেড আদায়ের দাবিতে প্রধান শিক্ষক সমিতি আন্দোলনে নামে। তবে প্রধান শিক্ষকদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সেই আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারেনি।

এ পরিস্থিতিতে এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে যে, সম্মিলিত শিক্ষক সমাজের সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া কেবল মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব কিংবা মহাপরিচালকদের সদিচ্ছা বা সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে দশম গ্রেডসহ পূর্ণ মর্যাদা আদায় সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা থেকেই অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাধ্য হয়ে ৪৫ জন প্রধান শিক্ষক মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেছেন।

রিট মামলার সর্বশেষ রায় প্রকাশের পর সাধারণ প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে রিটকারীদের নিয়ে একধরনের ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তবতা হলো—এই রায় সব প্রধান শিক্ষকের জন্য প্রযোজ্য নয়; এটি কেবলমাত্র ৪৫ জন রিটকারীর ক্ষেত্রেই কার্যকর। এই গুরুতর বিভ্রান্তি ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত—তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে বিষয়টি অনেকাংশে সার্বজনীন মামলা হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন না করার ফলও হতে পারে। কারণ, মামলার আরজিতে সবার জন্য দশম গ্রেডের দাবি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

আমাদের জাতিগত একটি দুর্বলতা রয়েছে—অনেকে সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় না করেই অর্জনের প্রত্যাশা করেন। কিছু ন্যায্য ও প্রয়োজনীয় কাজ সবাই করতে আগ্রহী হন না। অথচ নেতৃত্ব মানেই হলো সকলের পক্ষে দায়িত্ব গ্রহণ করা। প্রকৃত নেতৃত্বের গুণ হলো—সার্বজনীন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেওয়া।

তবুও রিটকারীদের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন প্রাপ্য। কারণ ৪৫ জন নয়, যদি মাত্র একজন প্রধান শিক্ষকও এই রিট দায়ের করতেন, তবুও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সকল প্রধান শিক্ষককে একই সুবিধা দিতে বাধ্য থাকত। এটি কোনো দয়া বা করুণা নয়—এটি একটি নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। সেই নৈতিক দায়িত্ব পালনে বৈষম্য এবং আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই এই নিবন্ধের অবতারণা।

মহামান্য হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা ছিল যে, প্রধান শিক্ষকদের ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মার্চ—যেদিন তারা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদায় উন্নীত হন—সেই তারিখ থেকেই আর্থিকসহ সকল সুবিধা প্রদান করতে হবে। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে আর্থিক সুবিধা কার্যকরের নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ না থাকায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ে মতামতের জন্য প্রেরণ করে। আইন মন্ত্রণালয় সর্বসম্মতভাবে ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মার্চ থেকেই আর্থিক সুবিধা প্রদানের আইনি মতামত প্রদান করে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মহামান্য হাইকোর্টের রায়, দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রদানের কার্যকর তারিখ এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট আইনি মতামত উপেক্ষা করে রিটকারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এবং সব প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দশম গ্রেডের আর্থিক সুবিধা প্রদানের আদেশ জারি করে। এই সিদ্ধান্ত স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক এবং ন্যায়বিচারের চেতনার পরিপন্থী।

এই আদেশের ফলে অধিকাংশ প্রধান শিক্ষকই কোনো বাস্তব আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। অতি নগণ্যসংখ্যক নবনিযুক্ত প্রধান শিক্ষক ছাড়া প্রায় সকলেই ইতোমধ্যে দশম গ্রেড অতিক্রম করেছেন। বিশেষ করে যারা ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মার্চের পর অবসর গ্রহণ করেছেন, তারা আশায় ছিলেন—অবসরকালীন সময়ে কিছুটা আর্থিক সুবিধা পেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অন্যদিকে বৈষম্যের চিত্র আরও ভয়াবহ—একই দেশে, একই পেশায় কর্মরত হয়েও রিটকারীদের জন্য সুবিধা কার্যকর ধরা হয়েছে ২০১৯ সাল থেকে, আর বাকি সকল প্রধান শিক্ষকের জন্য ২০২৫ সাল থেকে।

রিট মামলার মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকদের মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ একধাপ এগিয়ে গেলেও, কোনো পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য তৃতীয় বা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা কাম্য হতে পারে না। উন্নত বিশ্বের মতো সব শিক্ষকের মর্যাদা হওয়া উচিত সম্মানজনক ও ন্যায্য। কাজের কাঠিন্য ও দায়িত্বের ব্যাপকতা অনুযায়ী বেতন কাঠামোয় পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মর্যাদায় বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। এই ঐতিহাসিক ও আইনবহির্ভূত বৈষম্যের বিরুদ্ধে সব শিক্ষককে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।

একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের দাবি ও অধিকারকে প্রধান শিক্ষকদের আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং প্রধান শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনার বিষয়টিও সহকারী শিক্ষকদের সহমর্মিতার সঙ্গে ভাবতে হবে। একই ছাদের নিচে কর্মরত থেকে কোনো অবস্থাতেই পারস্পরিক বৈষম্য কাম্য হতে পারে না।

শিক্ষার্থী, দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী এবং শিক্ষক—সবার সম্মিলিত ভাবনাই পারে একটি সুখী, সুন্দর ও টেকসই সমাধানের পথ তৈরি করতে। বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ প্রাথমিক শিক্ষায় আজও দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরীরা জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত, সহকারী শিক্ষকরা তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে আবদ্ধ, আর প্রধান শিক্ষকরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় পেয়েও পড়েছেন শুভংকরের ফাঁকিতে। এসব সংকট থেকে উত্তরণে একমাত্র পথ হলো—সবার ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত প্রয়াস, যা খুব সহজেই এই সমস্যাগুলোর ন্যায্য সমাধান নিশ্চিত করতে পারে।

প্রাথমিক প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডের দাবির মূল সমস্যা কী?

দশম গ্রেড ঘোষণার পরও অধিকাংশ প্রধান শিক্ষক বাস্তবে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তগত বৈষম্যের কারণে এই গ্রেড কার্যকর হলেও তা অনেকের জন্য কেবল নামমাত্র হয়ে আছে।

হাইকোর্টের রায় কি সব প্রধান শিক্ষকের জন্য প্রযোজ্য?

না। হাইকোর্টের রায় সরাসরি কেবল ৪৫ জন রিটকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে আইনি ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একই অবস্থানে থাকা সব প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রেই এই সুবিধা প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

আর্থিক সুবিধা কোন তারিখ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল?

হাইকোর্টের রায় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের আইনি মতামত অনুযায়ী, ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মার্চ—যেদিন প্রধান শিক্ষকেরা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পান—সেই তারিখ থেকেই আর্থিক সুবিধা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

বাস্তবে কেন বেশিরভাগ প্রধান শিক্ষক আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন না?

কারণ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় রিটকারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সাল থেকে এবং অন্য সব প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে ২০২৫ সাল থেকে সুবিধা কার্যকরের আদেশ দিয়েছে। ফলে অধিকাংশ শিক্ষক ইতোমধ্যে দশম গ্রেড অতিক্রম করায় তারা কোনো বাস্তব সুবিধা পাচ্ছেন না।

এই বৈষম্য নিরসনে করণীয় কী?

এই আইনবহির্ভূত বৈষম্যের বিরুদ্ধে সব স্তরের শিক্ষককে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন ও আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক এবং অন্যান্য শিক্ষা কর্মীদের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ন্যায্য সমাধান নিশ্চিত করতে।

উপসংহার

প্রাথমিক শিক্ষায় দশম গ্রেড নিয়ে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্টতই শুভংকরের ফাঁকি ও বৈষম্যে পরিপূর্ণ। মহামান্য হাইকোর্টের রায়, দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রদানের কার্যকর তারিখ এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট আইনি মতামত উপেক্ষা করে যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা ন্যায়বিচার ও সমতার নীতির পরিপন্থী। এর ফলে অধিকাংশ প্রধান শিক্ষক, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ও অবসরপ্রত্যাশীরা ন্যায্য আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top