নিয়োগ-এমপিওতে অনিয়মও নিয়ম : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুনানিতে টাকার খেলা!

নিয়োগ-এমপিওতে অনিয়মও নিয়ম : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুনানিতে টাকার খেলা!

অনেক পরিশ্রম, আইন-বিধান ও প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনা, এবং বিভিন্ন তদবির উপেক্ষা করে ডিআইএ কর্মকর্তারা প্রতিবেদন তৈরি করেন। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে এমপিও স্থগিত বা বাতিলও করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর বা মাস পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুনানিতে অভিযুক্তদের আবারও তোলা হয়, যা কার্যত ‘নিলাম ডাকা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত প্রায় সবাইকেই খালাস দেওয়া হয়।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)-এর সাধারণ পরিদর্শন, তদন্ত এবং অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী অনেক শিক্ষক ও কর্মচারীর এমপিও স্থগিত বা বাতিল করা হয়। কখনো কখনো সরকারি কোষাগার থেকে এমপিও বাবদ গ্রহণ করা অর্থ ফেরত দেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয় ডিআইএর প্রতিবেদনে। আইন-বিধান, প্রজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন তদবির উপেক্ষা করে কর্মকর্তারা দীর্ঘ পরিশ্রমে এসব প্রতিবেদন তৈরি করেন। তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নও হয়।
কিন্তু কয়েক মাস বা বছরের ব্যবধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুনানিতে এসব মামলার অভিযুক্তদের তোলা হয়, যা অনেকের মতে ‘নিলাম ডাকা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত অধিকাংশকেই খালাস দেওয়া হয়—বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ফলে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়াই অনিয়ম করে নিয়োগ পাওয়া হাজার হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা এবং পরবর্তী পেনশন সুবিধা দিতে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও যাবে। অথচ এসব অনিয়ম ঠেকানোর দায়িত্ব প্রশাসন ক্যাডার নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—এই কর্মকর্তারাই ‘ম্যানেজ’ হয়ে যাচ্ছেন।
এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে নিয়োগবিধি বা আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে; এমনকি ডিআইএর মতো প্রতিষ্ঠান রাখার প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে, কারণ তাদের করা অধিকাংশ কাজই মন্ত্রণালয়ে পৌঁছামাত্র বাতিল হয়ে যায়। দৈনিক আমাদের বার্তার সঙ্গে আলাপে এমন অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আমাদের বার্তার অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ৪২তম সভায় মোট ১২টি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের শুনানিতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিল মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার তৈয়বুন্নেছা খানম সরকারি কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি থেকে সরকারি রূপ পেয়েছে, ফলে এর অধিকাংশ নিয়োগই ছিল বেসরকারি আমলের। কলেজটিতে অনার্স স্তরের শিক্ষাকার্যক্রমও চালু রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ডিআইএ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো নিরীক্ষা ও পরিদর্শন প্রতিবেদনের চতুর্থ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়—তৈয়বুন্নেছা খানম একাডেমি কলেজের ইংরেজির প্রভাষক তফাজ্জল হোসেন ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে যোগ দেন। সমাজ বিজ্ঞানের প্রভাষক ফাতেমা বেগম যোগ দেন ১ ডিসেম্বর ২০১২ সালে, আর একই বিষয়ের প্রভাষক সোহেল আহমদ যোগ দেন ২৯ নভেম্বর ২০১২ সালে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই তিনজনের কেউই শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারী নন। অথচ ২০০৫ সালের নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন আইন অনুযায়ী নিবন্ধন সনদ ছাড়া কোনো শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ।

অডিট আপত্তি ছিল এই তিনজনকে কেন্দ্র করে। এদের মধ্যে সোহেল আহমদ ইতিমধ্যে চাকরি ছেড়েছেন, আর বাকি দুইজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত শুনানিতে উপস্থিত হন। আমাদের বার্তার মৌলভীবাজার প্রতিনিধির তথ্য অনুযায়ী, শুনানিতে অংশ নিতে ঢাকা যাওয়া থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত অভিযুক্তদের বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা গেছে। স্থানীয়রা—এমনকি কলেজের পাশের চায়ের দোকানিরাও—জানেন, অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ও পরবর্তীতে সরকারিকরণ পাওয়া এসব শিক্ষক ‘ম্যানেজ’ করেই মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র পেয়ে থাকেন।

ডিআইএ-এর এক সাবেক পরিচালক দৈনিক আমাদের বার্তা-কে জানান, অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কোষাগার থেকে বেতন প্রদান করা সরকারের আর্থিক বিধিবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

যুগ্ম-সচিব জহিরুল মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তৈয়বুন্নেছা খানম সরকারি কলেজের শুনানিতে ছাড় পাওয়া এক শিক্ষক বলেন, “আমরা যোগাযোগ করেই শুনানিতে হাজির হয়েছি। ডিআইএ-এর তদন্ত বা পরিদর্শন প্রতিবেদনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।”

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চলতি বছরের ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও আইন শাখার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক শুনানিতে রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন জাল সনদধারী, বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের—এমনকি এক বিষয়ের শিক্ষক হয়েও অন্য বিষয়ে এমপিওভুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের—ডাকা হয়। তিন বছর আগে ডিআইএ-এর একটি অডিট ও তদন্তে এসব অনিয়ম শনাক্ত করে তাদের এমপিও স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছিল।

কিন্তু মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে অভিযুক্তরা ডিআইএ-এর ধরা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেয়। গত ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেই শুনানি শেষে দেখা যায়, প্রায় সব অভিযুক্তই ফুরফুরে মেজাজে মন্ত্রণালয় থেকে বের হচ্ছেন—কারণ তাদের স্থগিত থাকা এমপিও পুনর্বহাল করা হয়েছে।

শুনানিতে উপস্থিত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “বিধিবিধান তুলে ধরে আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাইকে খালাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সবাইকে বেশ মানবিক দেখাল!”

বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি ও প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান দৈনিক আমাদের বার্তা-কে বলেন, “শুনানি নামের এই নিলামের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের কোটি কোটি টাকা কর্মকর্তাদের পকেটে যায়। গত ১৬–১৭ বছরে যে ‘ধরা-ছাড়ার’ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।”

শুনানিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন কোনো মন্তব্য দেননি।

বর্তমানে দেশে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩২ হাজারের বেশি, আর এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। প্রতি মাসে এমপিও বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হয় এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নিয়মে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ হওয়ায় সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিষ্ঠা করে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

এমপিও–তে অনিয়ম বলতে কী বোঝায়?

এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগে জাল সনদ ব্যবহার, যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ পাওয়া, এক বিষয়ের শিক্ষক হয়েও অন্য বিষয়ে এমপিওভুক্ত হওয়া এবং কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সরকারিকরণ—এসবই প্রধান অনিয়ম হিসেবে ধরা হয়।

ডিআইএ (পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর) এসব অনিয়ম কীভাবে চিহ্নিত করে?

ডিআইএ নিয়মিত পরিদর্শন, তদন্ত, নথি যাচাই ও অডিটের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে। অনিয়ম ধরা পড়লে তারা সুপারিশসহ প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

তাহলে সমস্যা কোথায়? শুনানিতে সবাই খালাস পেয়ে যায় কেন?

অভিযোগ রয়েছে যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুনানি ‘নিলাম ডাকা’র মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে পর্যাপ্ত দলিল-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তরা বিভিন্ন প্রভাব ও টাকার খেলা ব্যবহার করে খালাস পেয়ে যান এবং আবার এমপিও সুবিধা ফিরে পান।

এই অনিয়মের আর্থিক প্রভাব কতটা?

অযোগ্য বা অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। মাসে এমপিও বাবদ ব্যয় হয় ১,০০০ কোটিরও বেশি টাকা।

এই পরিস্থিতি রোধে কী করা উচিত?

বিশেষজ্ঞদের মতে—

ডিআইএ-এর প্রতিবেদনকে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা,

শুনানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা,

ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা,

এবং অনিয়মে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যথায় নিয়োগ ও এমপিও ব্যবস্থা কার্যত অর্থ অপচয়ের অবাধ ক্ষেত্র হয়ে থাকবে।

উপসংহার

নিয়োগ ও এমপিও ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম এখন যেন অঘোষিত এক নিয়মে পরিণত হয়েছে। ডিআইএ বছরের পর বছর পরিশ্রম করে অনিয়ম চিহ্নিত করলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুনানির ‘মানবিকতা’ এবং টাকার প্রভাবের সামনে তা প্রায়ই ভেস্তে যায়। ফলে অনিয়ম করে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা যেমন দণ্ডমুক্তি পান, তেমনি সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা গচ্ছা যায়। এই ‘ধরা-ছাড়া’র সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে শিক্ষা খাতের শৃঙ্খলা, ন্যায্যতা এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার—সবই মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এখন প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির কড়া প্রয়োগ—যাতে শিক্ষা ব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top