কোচিং-গাইড বইয়ে শিক্ষার্থীরা কেনো নির্ভরশীল, প্রশ্ন শিক্ষা উপদেষ্টার

কোচিং-গাইড বইয়ে শিক্ষার্থীরা কেনো নির্ভরশীল, প্রশ্ন শিক্ষা উপদেষ্টার

শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, স্কুল-কলেজের প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুতর বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এখন তাদের অগ্রাধিকারমূলক দায়িত্বগুলোর অন্যতম।

কোচিং, প্রাইভেট টিউশন ও গাইড বইয়ের বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেছেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই এগুলো বন্ধ করা যাবে না। কেন এসবের চাহিদা তৈরি হচ্ছে—সেটি আগে বুঝতে হবে। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা কেন কোচিং বা গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বুধবার রাজধানীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ শিক্ষাবিদ, শিক্ষা পরিবারের সদস্য, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষা উপদেষ্টা আরও জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার দুই ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতির সমন্বয় ভবিষ্যতে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। তিনি বলেন, খসরুজ্জামান আহমেদের নেতৃত্বে মাধ্যমিক শিক্ষার একটি বিস্তৃত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই চলমান রয়েছে।

শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেছেন, স্কুল-কলেজের প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতি ঠিক করা এখন অত্যন্ত জরুরি দায়িত্বগুলোর একটি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের যে উদ্বেগ রয়েছে, তা দূর করতে বাস্তবভিত্তিক ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের বিকল্প নেই। অভিভাবক, শিক্ষকসহ সবাই মানের অবনতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও গ্রাসরুট পর্যায়ের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো আরও গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন।

শিক্ষা উপদেষ্টা জানান, শিক্ষার মানোন্নয়নে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভবিষ্যৎ নীতিমালার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কোথায় অবস্থান করছে তা জানার জন্য সরকার একটি আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন কাঠামোর সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। “আমরা হয়তো নিচের দিকে থাকতে পারি—তাতে সমস্যা নেই। অন্তত বুঝতে পারব আমরা কোথায় আছি এবং কী পরিবর্তন প্রয়োজন,”—যোগ করেন তিনি।

পূর্ববর্তী সময়ে পরীক্ষা ছাড়া নম্বর প্রদান করার নীতির সমালোচনা করে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, “পরীক্ষা না নিয়ে নম্বর দেওয়া ছিল অগ্রহণযোগ্য। এটি শিক্ষাব্যবস্থাকে পিছনে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা সেই অবস্থান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেছি।”

তিনি আরও জানান, মূল্যায়নে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের পাঠ–বোঝার ক্ষমতা এবং গণিত দক্ষতা উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা রয়েছে। এসব বিষয়ে আরও বৃহৎ পরিসরে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গবেষকদের সঙ্গে পরবর্তী বৈঠক আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্ত্রণালয়ে এসে বিস্তারিত উপস্থাপন করবেন। “আমরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করব,”—বলেন তিনি।

শেষে তিনি শিক্ষা খাতের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

শিক্ষার্থীরা কেন কোচিং ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?

প্রধান কারণ হলো পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি ও বোঝার সমস্যাগুলো। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে কোচিং ও গাইড বই সহজভাবে বিষয়গুলো বুঝিয়ে দেয়।

শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কি কোচিং বা গাইড বই বন্ধ করা সম্ভব?

শিক্ষা উপদেষ্টার মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এগুলো বন্ধ করা যাবে না। চাহিদা কেন তৈরি হচ্ছে—সেটি আগে বোঝা জরুরি।

অভিভাবকরা কেন কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন?

অনেকে মনে করেন কোচিং অতিরিক্ত সহায়তা দেয় এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা বাড়ায়। স্কুলের ক্লাসে পর্যাপ্ত মনোযোগ না পাওয়াও একটি কারণ।

গাইড বই ব্যবহার কি শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?

অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীর সৃজনশীল চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও মূল পাঠ্যবই পড়ার অভ্যাস কমিয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।

সমস্যার সমাধানে সরকার কী করছে?

সরকার শিক্ষার মান উন্নয়ন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সংস্কার এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে কোচিং ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা কমে।

উপসংহার

কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার দিক নির্দেশ করে। শিক্ষা উপদেষ্টা যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা শুধু বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা নয়—বরং মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান। মানসম্মত পাঠদান, সৃজনশীল মূল্যায়ন, শিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদ্যালয়কে শিক্ষার মূল কেন্দ্র হিসেবে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করলেই এ নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top